জাপানের ভাড়াটে পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিস
জাপানের ভাড়াটে পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিস আসলে কী, কেন মানুষ নিজের পরিবারের বদলে অন্যদের ভাড়া করছে-এই গল্পটা জানলে অবাক হবেন। একাকীত্ব, ব্যস্ত জীবন আর সামাজিক দূরত্ব মিলিয়ে সেখানে তৈরি হয়েছে এক নতুন ধরনের "অস্থায়ী সম্পর্ক"।
এই অদ্ভুত কিন্তু আবেগঘন সেবার পেছনের কারণ, খরচ ও চমকে দেওয়া সত্য জানতে পুরো লেখাটি পড়ুন। জাপানের সমাজে বদলে যাওয়া সম্পর্কের এক ভিন্ন দিক এখানে সহজ ও মানবিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই পুরো বিষয়টা শুধু সার্ভিস না, অনেকটা আবেগ ও শূন্যতার গল্প।
পেজ সূচিপত্রঃ জাপানের ভাড়াটে পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিস
- জাপানের ভাড়াটে পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিস
- এই সার্ভিসটা জাপানে কবে থেকে শুরু হলো আর কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো?
- কারা কারা নেয় এই ভাড়াটে পরিবারের সেবা, কেন নেয়?
- রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিসের কিছু আসল উদাহরণ যা শুনলে অবাক লাগবে
- কত টাকা খরচ হয় জাপানে এমন পরিবার ভাড়া করতে?
- এই সার্ভিসের নিয়মকানুন কেমন, কী করা যায় আর কী যায় না?
- জাপানের সমাজে কেন এত জনপ্রিয় হয়েছে এই ভাড়াটে পরিবারের ধারণা?
- রেন্ট এ ফ্যামিলির সাথে জড়িত কিছু বাস্তব গল্প যা মনে দাগ কাটে
- এই সেবার ভালো দিক আর খারাপ দিক কী কী?
- শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
জাপানের ভাড়াটে পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিস
জাপানের ভাড়াটে পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিস টি আসলে একটা বেশ অনন্য
ব্যবসা, যেখানে প্রফেশনাল অভিনেতারা ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী পরিবারের সদস্য
বা বন্ধু সেজে কাজ করে। এটা একাকিত্ব কমাতে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে সাহায্য করতে
ব্যবহার হয়। নিচে সেবার ধরন, গ্রহণের প্রক্রিয়া আর নিয়মাবলী একে একে লিখে দেওয়া হলো,
প্রত্যেকটায় সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সহ।
সেবার ধরনঃ
- পরিবার সদস্য সেজে অভিনয়ঃ বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে বা দাদা-দিদির ভূমিকায় অভিনেতা পাঠিয়ে সামাজিক চাপ বা একাকিত্ব কমানো হয়।
- ইভেন্টে অংশ নেওয়াঃ বিয়ে, শেষকৃত্য, পারিবারিক মিলন বা স্কুল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সংখ্যা পূরণ বা ছবি তোলার সাহায্য করে।
- সঙ্গ দেওয়াঃ ডিনার, বেড়ানো, কথা বলা বা টিভি দেখার মতো সময় কাটিয়ে মানসিক স্বস্তি দেয়, প্লেটোনিকভাবে।
- ব্যবসায়িক বা অন্যান্য ভূমিকাঃ সহকর্মী, বস বা বন্ধু সেজে মিটিং, পার্টি বা হাসপাতালে সঙ্গী হিসেবে যায়।
সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়াঃ
- প্রথমে যোগাযোগঃ কোম্পানির ওয়েবসাইট, ফোন বা ইমেইলে কল করে চাহিদা জানানো হয়, সাধারণত ১-২ দিনের মধ্যে উত্তর আসে।
- বিস্তারিত ফর্ম পূরণঃ তারিখ, সময়, জায়গা, ভূমিকার ধরন, চেহারা, বয়স আর ব্যাকস্টোরি (যেমন কীভাবে পরিচয় হলো) সব লিখতে হয় যাতে অভিনেতা প্রস্তুত হয়।
- কনসালটেশন ও বুকিংঃ কোম্পানি অভিনেতা নির্বাচন করে, প্রয়োজনে ফোন বা মিটিংয়ে আলোচনা হয়, তারপর পেমেন্ট করে কনফার্ম করা হয়।
- সেবা চলাকালীনঃ নির্ধারিত জায়গায় মিটিং হয়, অভিনেতা পুরোপুরি চরিত্রে থেকে কাজ করে এবং শেষে রিপোর্ট জমা দেয়।
নিয়মাবলিঃ
- কোনো শারীরিক স্পর্শ নয়ঃ যৌনতা বা ঘনিষ্ঠ স্পর্শ একেবারে নিষিদ্ধ, শুধু কথা আর অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
- গোপনীয়তা রক্ষাঃ ক্লায়েন্টের তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়, অভিনেতা কখনো বাস্তব জীবনে যোগাযোগ করতে পারে না।
- একবারের নিয়মঃ অনেক কোম্পানিতে একই ভূমিকা একই ক্লায়েন্টের সাথে বারবার করা যায় না, যাতে আসক্তি না হয়।
- অবৈধ কাজ নিষিদ্ধঃ কোনো অপরাধমূলক বা নৈতিকতাবিরোধী অনুরোধ মানা হয় না, যেমন পরিবার ভাঙার মতো কাজ।
- পেমেন্ট ও লজিস্টিকঃ সাধারণত আগাম টাকা দিতে হয় (৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার ইয়েন প্রতি সেশন), রাত্রিযাপন হলে আলাদা রুম বাধ্যতামূলক।
এই সার্ভিসটা জাপানে ১৯৯০-এর দশক থেকে চলছে এবং এখন প্রায় ৩০০টা কোম্পানি
আছে।
এই সার্ভিসটা জাপানে কবে থেকে শুরু হলো আর কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো?
দেখুন, জাপানের এই ভাড়াটে পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিসের শুরুটা
হয়েছিল নব্বই দশকের একেবারে গোড়ায়, ঠিক ১৯৯১ সালে। তখন জাপান এফিশিয়েন্সি
কর্পোরেশন নামে একটা কোম্পানি প্রথম এই ধারণাটা বাজারে নিয়ে আসে। আসলে ওরা আগে
শুধু কর্পোরেট ট্রেনিং আর প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্টের কাজ করত। কিন্তু
ক্লায়েন্টরা একদিন বলতে শুরু করল যে তাদের অফিসের বাইরের জীবনটা খুব একা লাগে,
পরিবারের সাপোর্ট নেই, কেউ নেই যার সাথে সাধারণ কথা বলা যায় বা ছোটখাটো
ইভেন্টে সঙ্গী হিসেবে নেয়া যায়। তখনই কোম্পানির লোকজন ভাবল, যদি অভিনেতাদের
দিয়ে একটা পুরো পরিবার সাজিয়ে দেয়া যায়? সেই চিন্তা থেকেই এই ব্যবসাটা জন্ম
নেয়।
প্রথমদিকে এটা ছিল খুব ছোট পরিসরে, কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে
পড়তে শুরু করল। আজকের দিনে জাপানে তিনশোরও বেশি কোম্পানি এই সার্ভিস চালাচ্ছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ফ্যামিলি রোম্যান্স, যার মালিক ইউইচি ইশি। ওঁর
কোম্পানিতে এখন হাজারেরও বেশি প্রশিক্ষিত অভিনেতা আছে যারা নানা ধরনের ভূমিকায়
অভিনয় করে। সময়ের সাথে সাথে এই সেবাটা আরও অনেক দূর ছড়িয়ে পড়েছে।
শুরুতে যেটা ছিল শুধু একা মানুষের সঙ্গ দেয়ার জন্য, সেটা এখন ওয়েডিংয়ের
গেস্ট, ফিউনারেলে কান্নাকাটি করা লোক, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য ফেক
ফ্যামিলি ফটো পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। মানুষের চাহিদা আর সমাজের চাপের কারণে এটা
একটা সাধারণ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যা আজ আর শুধু জাপানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
কারা কারা নেয় এই ভাড়াটে পরিবারের সেবা, কেন নেয়?
জাপানে এই ধরনের সেবা নেওয়া মানুষের সংখ্যা এখন আর তেমন কম নয়। জাপানের ভাড়াটে
পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিস মূলত গ্রহণ করেন যারা বাস্তব জীবনে
পরিবারের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত বা একেবারে একা জীবনযাপন করেন। এর মধ্যে একা মায়েরা
সন্তানকে বাবার স্নেহ দিতে চান, বয়স্ক ব্যক্তিরা নাতি-নাতনির সাথে সময় কাটাতে
আগ্রহী হন, আবার অনেক যুবক-যুবতী সামাজিক চাপ এড়াতে ওয়েডিং বা অন্যান্য
অনুষ্ঠানে পুরো পরিবার দেখানোর জন্য এই সার্ভিস নেন।
একজন স্যালারিম্যানের গল্প শুনলে অবাক লাগে-তিনি ছয় বছর ধরে একই অভিনেত্রীকে
স্ত্রী এবং একটি মেয়েকে কন্যা সাজিয়ে রেখেছেন কারণ তার নিজের কোনো পরিবার নেই।
আসলে এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো গভীর একাকীত্ব আর সমাজের প্রত্যাশা থেকে
কিছুটা মুক্তি পাওয়া।
রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিসের কিছু আসল উদাহরণ যা শুনলে অবাক লাগবে
জাপানের এই সার্ভিসের কিছু ঘটনা শুনলে সত্যি অবাক হয়ে যেতে হয়। একজন মা তার
মেয়ের জন্য নয় বছর ধরে একই অভিনেতাকে বাবা সাজিয়ে রেখেছিলেন। মেয়েটি কখনো
জানতেই পারেনি যে সে তার আসল বাবা নয়, বরং ভাড়া করা একজন মানুষ। আরেকটি গল্পে
এক বয়স্ক মহিলা তার ভাড়া করা নাতির সাথে শপিং করতে গিয়ে এতটাই খুশি হয়েছিলেন
যে তিনি বলেছিলেন, "এটা ভাড়া হলেও আমার কাছে পুরোপুরি সত্যি মনে হয়।" এসব
উদাহরণ দেখে বোঝা যায় কতটা গভীরভাবে মানুষ একটা সাধারণ পরিবারের অনুভূতি
খুঁজে বেড়ায়।
আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, অনেকে ওয়েডিং অনুষ্ঠানে পুরো ত্রিশ জনের একটা
ফ্যামিলি ভাড়া করে নেন যাতে আত্মীয়-স্বজনরা ভাবে তাদের অনেক লোকজন আছে।
ফ্যামিলি রোম্যান্স কোম্পানি তো সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য পুরো ফেক ফটো শুটিংয়ের
ব্যবস্থাও করে দেয়। এই সব ঘটনা শুনলে মনে হয় জীবনটা কতটা জটিল হয়ে উঠেছে, আর
মানুষ কত সহজে মিথ্যার ওপর ভর করে সুখ খুঁজে নেয়। কিন্তু একই সাথে এটা বোঝায়
যে একাকীত্ব কতটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকের সমাজে।
কত টাকা খরচ হয় জাপানে এমন পরিবার ভাড়া করতে?
এই ধরনের সেবার খরচটা আসলে খুব বেশি নয়, তবে পুরোপুরি নির্ভর করে আপনি কতক্ষণের
জন্য কী ধরনের সেবা চান তার ওপর। সাধারণত এক ঘণ্টার জন্য শুরু হয় আট হাজার ইয়েন
থেকে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাত হাজার টাকার মতো পড়ে। জাপানের ভাড়াটে
পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিস এর খরচ এভাবেই ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী
ওঠানামা করে। ওয়েডিংয়ের গেস্ট হিসেবে একজনকে ভাড়া করতে গেলে প্রতি জনের জন্য
বিশ হাজার ইয়েনের মতো খরচ হয়। আর যদি স্পিচ দিতে হয় বা গান গাইতে হয় বা অন্য
কোনো বিশেষ কাজ করতে হয় তাহলে খরচ আরও বেড়ে যায়।
পুরো একটা ফ্যামিলি নিলে তো লাখ লাখ টাকা পর্যন্ত চলে যেতে পারে, কিন্তু এটা
একেবারে ব্যক্তিগত প্যাকেজের ওপর নির্ভরশীল। তবে যারা এই সেবা নেন তারা প্রায়ই
বলেন যে এই খরচের বিনিময়ে যে মানসিক শান্তি আর সামাজিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া
যায় সেটা কোনো টাকায় মাপা যায় না। অনেকের কাছে এটা শুধু খরচ নয়, বরং এক ধরনের
বিনিয়োগ যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সহজ করে দেয়।
এই সার্ভিসের নিয়মকানুন কেমন, কী করা যায় আর কী যায় না?
জাপানের এই সার্ভিসের নিয়মকানুন খুবই কড়া আর স্পষ্ট। কোনো ধরনের শারীরিক
সম্পর্ক একদম নিষিদ্ধ, সবকিছু পুরোপুরি প্ল্যাটোনিক রাখতে হয়। অভিনেতারা
শুধুমাত্র ক্লায়েন্টের দেয়া স্ক্রিপ্ট অনুসারে কাজ করেন, কিন্তু তার বাইরে
কোনো অতিরিক্ত সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় না। এই নিয়মগুলো মেনে চললে ক্লায়েন্ট
যতদিন চান ততদিন সেবা নিতে পারেন, তবে সবসময় কোম্পানির তত্ত্বাবধানে। অনেক
ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টরা দীর্ঘদিনের জন্য একই অভিনেতাকে ভাড়া করে রাখতে চান।
জাপানের ভাড়াটে পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি সার্ভিস এখানে খুব সাবধানে কাজ করে
যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না হয়।
তবে একবার এই সম্পর্ক শুরু করলে সত্যি কথা বলা খুব কঠিন হয়ে যায়, কারণ
মিথ্যার জালটা ধীরে ধীরে জটিল হতে থাকে। কোম্পানিগুলো সবসময় ক্লায়েন্টদের
সতর্ক করে দেয় যে, "আপনি কি এই মিথ্যাটা সারাজীবন চালিয়ে যেতে পারবেন?" কারণ
একবার ধরা পড়লে মানসিক আঘাত অনেক বড় হতে পারে। তাই যারা এই সেবা নেন তাদের
আগে ভালো করে ভাবতে হয় যে এটা তাদের জীবনের সাথে কতটা মানিয়ে নেয়া যাবে। সব
মিলিয়ে নিয়মগুলো এমনভাবে তৈরি যাতে কোনো পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
জাপানের সমাজে কেন এত জনপ্রিয় হয়েছে এই ভাড়াটে পরিবারের ধারণা?
জাপানের সমাজটা এমনিতেই খুব ব্যস্ত আর চাপের মধ্যে চলে। মানুষ সকাল থেকে রাত
পর্যন্ত অফিসে ডুবে থাকে, ওভারটাইম করে, আর বাড়ি ফিরে শুধু ঘুমানোর সময়
পায়। এই কাজের চাপে আসল পরিবারের সঙ্গটা অনেক দূরে সরে যায়। অনেকে বিয়ে
করতে চায় না বা সন্তান নেয় না কারণ জীবনযাত্রার খরচ আর সময়ের অভাব। ফলে
ধীরে ধীরে একা লাগতে শুরু করে, কিন্তু সমাজের সামনে সবকিছু ঠিকঠাক দেখানোর
দায়িত্বটা থেকে যায়। এই একাকীত্বের সাথে যোগ হয়েছে সামাজিক চাপ। জাপানে
এখনও “পারফেক্ট ফ্যামিলি” দেখানোর একটা অদৃশ্য নিয়ম আছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে বা কোনো পারিবারিক ইভেন্টে যদি আত্মীয়স্বজন না থাকে তাহলে
অনেক কথা শুনতে হয়। বয়স্করা নাতি-নাতনির সঙ্গ চান কিন্তু আসল পরিবার দূরে।
তাই এই ধরনের সেবা অনেকের কাছে সহজ একটা সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা শুধু
সময় কাটানো নয়, বরং মানসিক শান্তি আর সামাজিক মর্যাদা দুটোই দিয়ে যায়। এ
কারণেই আজ জাপানে এই ধারণাটা এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
মানুষ বুঝতে পেরেছে যে আসল সম্পর্ক না থাকলেও একটা সাজানো পরিবার অনেক
সমস্যার সমাধান করতে পারে। জাপানের ভাড়াটে পরিবার বা রেন্ট এ ফ্যামিলি
সার্ভিস এখন আর শুধু ব্যবসা নয়, বরং সমাজের একটা প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। তাই
এর জনপ্রিয়তা কমার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
রেন্ট এ ফ্যামিলির সাথে জড়িত কিছু বাস্তব গল্প যা মনে দাগ কাটে
এই সার্ভিসের সঙ্গে জড়িত কয়েকটা আসল গল্প শুনলে মনে হয় জীবনটা কতটা অদ্ভুতভাবে
চলে। একজন অভিনেতা একবার বলেছিলেন যে তিনি একটা ছোট মেয়ের বাবা সেজে এত বছর
কাটিয়েছেন যে মেয়েটি এখন বড় হয়ে বিয়ে করলে তাকেও বাবা হিসেবে অনুষ্ঠানে যেতে
হবে। মেয়েটি কখনো জানতেই পারেনি যে তার “বাবা” আসলে ভাড়া করা একজন মানুষ।
আরেকটা গল্পে এক বয়স্কা মহিলা তার ভাড়া করা নাতির সঙ্গে শপিং করতে গিয়ে এত খুশি
হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি বলে উঠেছিলেন, "এটা ভাড়া হলেও আমার কাছে পুরোপুরি সত্যি
মনে হয়।"
আরো পড়ুনঃ দুবাই বিগ টিকিট লটারি কেনার উপায় জানুন
এই দুটো ঘটনা শুনলেই বোঝা যায় কতটা গভীরভাবে মানুষ একটা সাধারণ পরিবারের
অনুভূতি খুঁজে বেড়ায়। এই গল্পগুলো শুধু অবাক করে না, বরং মনে একটা দাগও কেটে
যায়। কারণ এখানে দেখা যায় যে অভিনয়ের আড়ালে অনেক সময় আসল সম্পর্কের মতোই আবেগ
তৈরি হয়ে যায়। অভিনেতারা নিজেরাও বলেন যে ক্লায়েন্টের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাটানোর
পর তাদেরও মনে হয় এটা আর শুধু চাকরি নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এসব গল্প আমাদের
সামনে তুলে ধরে যে আজকের সমাজে একাকীত্ব কতটা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ যখন পয়সা
দিয়ে পরিবার কিনতে বাধ্য হয় তখন বোঝা যায় আমরা আসলে কতটা একা হয়ে গেছি।
এই সেবার ভালো দিক আর খারাপ দিক কী কী?
এই সেবার সবচেয়ে বড় ভালো দিক হলো এটা অনেক মানুষের একাকীত্ব অনেকটা কমিয়ে
দেয়। যারা সত্যি সত্যি পরিবারের সঙ্গ পান না, তাদের জন্য একটা সাজানো পরিবার
অনেক সময় মানসিক শান্তি দেয়। বয়স্ক মানুষেরা নাতি-নাতনির সঙ্গ পেয়ে খুশি হন,
একা মায়েরা সন্তানকে বাবার স্নেহ দেখাতে পারেন, আর যুবক-যুবতীরা সামাজিক চাপ
থেকে একটু হলেও মুক্তি পান। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, দৈনন্দিন জীবনটা একটু
হালকা লাগে। অনেক ক্লায়েন্ট বলেন, এই সেবা তাদের জীবনে এক ধরনের সাপোর্ট
সিস্টেম তৈরি করে দেয় যা আসল পরিবার না থাকলেও অনেকটা পূরণ করে।
অন্যদিকে খারাপ দিকও কম নয়। পুরো ব্যাপারটা তো মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাই
সম্পর্কগুলো কখনোই পুরোপুরি সত্যি হয় না। যদি কোনোদিন সত্যি বেরিয়ে পড়ে তাহলে
ক্লায়েন্টের মানসিক আঘাত অনেক বড় হতে পারে। অভিনেতারা নিজেরাও অনেক সময় আসল
আবেগ জড়িয়ে ফেলেন, কিন্তু শেষমেশ এটা একটা ব্যবসায়িক চুক্তি। তাই দীর্ঘদিন
চললে এই মিথ্যাটা জীবনের অন্যান্য সম্পর্ককেও জটিল করে দিতে পারে। সব মিলিয়ে
এটা সুবিধা দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই সুবিধার পেছনে একটা বড় ঝুঁকিও লুকিয়ে থাকে।
শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
আমার মনে হয় জাপানের এই ভাড়াটে পরিবারের সার্ভিসটা ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে ছড়িয়ে
পড়বে। ইতিমধ্যে এ নিয়ে সিনেমাও বানানো হয়েছে, যেমন 'রেন্টাল ফ্যামিলি' যাতে
ব্রেন্ডান ফ্রেজার অভিনয় করেছেন। এটা শুধু জাপানে সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বের
অন্যান্য দেশেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা হলো-আমরা
কি সত্যিকারের সম্পর্ক চাই, নাকি শুধু দেখানোর জন্য একটা সাজানো ছবি? এই সেবাটা
আমাদের সবাইকে ভাবিয়ে তোলে যে মানুষের সঙ্গে মানুষের আসল যোগাযোগ কতটা জরুরি।
আপনার কী মনে হয়? বাংলাদেশে এমন সার্ভিস চালু হলে কেমন হতো? কমেন্টে জানান। এমন
আরো সুন্দর সুন্দর আর্টিকেল পেতে অর্ডিনারি আইটির পেজকে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন
ধন্যবাদ। 260416


