শিশুর খাবারে রুচি না হলে করণীয়
শিশুর খাবারে রুচি না হলে করণীয় নিয়ে চিন্তায় আছেন? অনেক বাবা-মায়ের মতো
আপনিও হয়তো প্রতিদিন একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। খাবারের টেবিলে ছোট্ট কিছু
পরিবর্তনই কখনো বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। কীভাবে শিশুকে খাবারের প্রতি আগ্রহী
করা যায়, সেটিও জানুন
কোন খাবার শিশুর আগ্রহ বাড়ায়, আর কোন অভ্যাস ক্ষুধা কমিয়ে দেয়, তা সহজ ভাষায়
জানুন। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কার্যকর টিপস দিয়ে সাজানো এই আর্টিকেলটি আপনার কাজে
আসবে। জোর না করে কীভাবে শিশুকে খাবারের প্রতি আগ্রহী করা যায়, জেনে নিন।
পেজ সুচিপত্রঃ শিশুর খাবারে রুচি না হলে করণীয়
শিশুর খাবারে রুচি না হলে করণীয়
শিশুর খাবারে রুচি না হলে করণীয়-এই প্রশ্নটা প্রায় প্রতিটা মায়ের মুখে শোনা
যায়। বাচ্চা খেতে চাইছে না, মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে, আর আপনি বাটি হাতে ছুটছেন পেছনে
পেছনে। এই দৃশ্যটা চেনা লাগছে, তাই না? আসলে বাচ্চার খাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তাটা
অনেক গভীর। শুধু খাবার না খাওয়া না, মনে হয় যেন পুরো পৃথিবীটাই উল্টে গেছে।
কিন্তু একটু থামুন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা কোনো বড় সমস্যা না, বরং একটু বুদ্ধি
করে এগোলেই সমাধান পাওয়া যায়। প্রথমেই যেটা করবেন-জোর করা বন্ধ করুন। জোর করে
খাওয়ালে বাচ্চার মনে খাবারের প্রতি একটা ভয় বা বিরক্তি তৈরি হয়। সে খাবারকে
আনন্দের জায়গা না ভেবে শাস্তির জায়গা ভাবতে শুরু করে। আর একবার সেই ধারণা
মাথায় ঢুকলে, বের করা কঠিন।
খাবারের পরিবেশটা বদলে দিন। একই রুটিনে, একই বাটিতে, একই রান্না-এটা বড়দের জন্যও
বিরক্তিকর। বাচ্চার প্লেটে রঙিন সবজি সাজিয়ে দিন, ছোট ছোট মজার শেপে কেটে দিন।
চোখ আগে খায়, তারপর মুখ। রুচি কমে যাওয়ার পেছনে শারীরিক কারণও থাকতে পারে। দাঁত
উঠছে কিনা, পেটে গ্যাস হচ্ছে কিনা, বা ঠান্ডা লেগেছে কিনা-এগুলো একটু খেয়াল
করুন। অনেক সময় শরীর ঠিক না থাকলে বাচ্চা এমনিতেই খেতে চায় না, সেটা স্বাভাবিক।
বাচ্চাকে খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ দিন।
"আজকে কী খাবে, ডিম না ডাল?"-এই ছোট্ট প্রশ্নটাই ওর মধ্যে একটা অংশীদারিত্বের
অনুভূতি তৈরি করে। নিজে বেছে নিলে খাওয়ার আগ্রহটাও একটু বাড়ে। এটা ছোট কৌশল,
কিন্তু কাজ করে। খাওয়ার সময়টাকে গল্পের সময় বানিয়ে ফেলুন। "এই গাজরটা খেলে
তুমি গাড়ির মতো জোরে দৌড়াতে পারবে"-বাচ্চারা এই কল্পনার জগতে বাঁচে। খাবারকে
একটা অ্যাডভেঞ্চারের অংশ করে দিন, দেখবেন নিজেই হাত বাড়াচ্ছে। সবশেষে বলব, ধৈর্য
রাখুন। একদিনে সব বদলাবে না। কিন্তু প্রতিদিন একটু একটু করে চেষ্টা করলে, বাচ্চার
খাবারের অভ্যাস ঠিকই তৈরি হবে। আপনি হাল ছাড়লে চলবে না-কারণ আপনিই ওর সবচেয়ে
বড় ভরসার জায়গা।
কখন ডাক্তার দেখানো দরকার
সব সমস্যার সমাধান ঘরে বসে হয় না। বাচ্চা যদি টানা কয়েকদিন ধরে কিছুই না খায়,
শুধু পানি বা দুধেও আগ্রহ না দেখায়, তাহলে সেটাকে আর "একটু কম খাচ্ছে" বলে
এড়িয়ে যাওয়া ঠিক না। এই সময়টাতেই একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া দরকার। ওজন
যদি হঠাৎ কমতে শুরু করে, সেটা একটা বড় সংকেত। বাচ্চা সক্রিয় থাকছে না, সারাদিন
ঝিমিয়ে আছে, বা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি কান্নাকাটি করছে-এগুলো দেখলে দেরি
না করাই ভালো। শরীর নিজেই বলছে যে ভেতরে কিছু একটা ঠিক নেই। পেট ফোলা, বমি বমি
ভাব, বা খাওয়ার পরপরই বমি করে ফেলা-এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে ডাক্তারের কাছে
যাওয়াটা আর ঐচ্ছিক না, জরুরি।
আরো পড়ুনঃ শীতে শিশুর যত্নে ৮ খাবার সম্পর্কে জানুন
হজমের কোনো সমস্যা বা ইনফেকশন থেকেও এমন হতে পারে। আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন না
কারণটা, কিন্তু ডাক্তার পারবেন। অনেক বাবা-মা ভাবেন, "একটু পরে ঠিক হয়ে যাবে।"
এই "একটু পরে"টাই অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। শিশুর শরীর খুব দ্রুত পানিশূন্য হয়ে
পড়তে পারে, পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই নিজে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে একজন
বিশেষজ্ঞের মতামত নিন-এটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
খাওয়ার সময় ঘরের পরিবেশ
খাওয়ার সময় ঘরের পরিবেশ নিয়ে আমরা সাধারণত খুব একটা ভাবি না। কিন্তু বাচ্চার
খাওয়ার অভিজ্ঞতায় পরিবেশ একটা বিশাল ভূমিকা রাখে। টিভি চলছে, ফোনে কার্টুন
বাজছে, আর পাশে বড়রা জোরে কথা বলছে-এই অবস্থায় বাচ্চার মনোযোগ খাবারে থাকবে
কীভাবে? খাওয়ার টেবিলটাকে একটা শান্ত, আনন্দের জায়গা বানান। চিৎকার নেই, তাড়া
নেই, জোরাজুরি নেই। শিশুর খাবারে রুচি না হলে করণীয় হলো আগে পরিবেশটা ঠিক করা,
তারপর খাবারের দিকে মনোযোগ দেওয়া। পরিবেশ ঠিক থাকলে অর্ধেক সমস্যা এমনিতেই কমে
যায়। বাচ্চাকে পরিবারের সাথে একসাথে বসিয়ে খাওয়ান।
বড়রা খাচ্ছে, সবাই একসাথে আছে-এই দৃশ্যটা বাচ্চার মনে খাওয়াকে একটা সুন্দর
অভ্যাস হিসেবে গেঁথে দেয়। একা একা খাওয়ানোর চেয়ে এই পদ্ধতি অনেক বেশি কার্যকর,
বিশ্বাস করুন। খাওয়ার জায়গাটা সবসময় পরিষ্কার আর গোছানো রাখুন। ছোট্ট একটা
রঙিন প্লেট, পছন্দের বাটি-এই ছোট ছোট জিনিসগুলো বাচ্চার মনে খাওয়ার প্রতি একটা
ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে। পরিবেশটা যখন আপন মনে হয়, খাওয়ার আগ্রহটাও তখন নিজেই
আসে।
সহজ ও আকর্ষণীয় খাবারের আইডিয়া
বাচ্চাকে খাওয়ানোর সবচেয়ে বড় ট্রিকস হলো খাবারটাকে মজাদার করে তোলা। একই
ডাল-ভাত প্রতিদিন দিলে বড়রাও বিরক্ত হয়, বাচ্চারা তো আরও বেশি। একটু ক্রিয়েটিভ
হন, খাবারের সাথে একটু খেলুন-দেখবেন বাচ্চা নিজেই আগ্রহ দেখাচ্ছে। সবজিগুলো ছোট
ছোট তারা বা হার্টের শেপে কেটে দিন। গাজর, বিট, শসা-এগুলো রঙিন এবং চোখে পড়ার
মতো। বাচ্চার প্লেটটা যখন দেখতে সুন্দর লাগে, তখন সে খাবারের দিকে হাত বাড়াতে
আগ্রহী হয়। চোখের আকর্ষণ থেকেই খাওয়ার শুরু হয়। ডিমের অমলেটে সবজি মিশিয়ে
দিন, বা ছোট্ট রুটি দিয়ে মজার রোল বানিয়ে দিন। পরোটার ভেতরে পছন্দের কিছু পুরে
দিলে বাচ্চা সেটাকে "স্পেশাল খাবার" মনে করে।
এই ছোট্ট কৌশলটা কাজে লাগান, অনেক মায়েরই উপকার হয়েছে। ফলের সাথে একটু মধু বা
দইয়ের মিশ্রণ বানিয়ে দিন। কলা, আম, পেঁপে-এগুলো ছোট্ট বাটিতে সুন্দর করে
সাজিয়ে দিলে বাচ্চার কাছে এটা যেন একটা ডেজার্টের মতো মনে হয়। পুষ্টিকর হচ্ছে,
আবার বাচ্চাও খুশি-দুটো কাজ একসাথে হয়ে যাচ্ছে। নুডলস বা পাস্তায় রঙিন সবজি আর
হালকা সস মিশিয়ে দিন। বাচ্চারা এই ধরনের খাবারে সাধারণত বেশি আগ্রহ দেখায়, কারণ
এটা দেখতে মজার আর খেতেও ভালো লাগে। আপনি একটু পরিশ্রম করলে বাচ্চার পুষ্টির
চাহিদাও পূরণ হবে, মনও খুশি থাকবে।
খেলার সাথে খাওয়ানোর উপায়
বাচ্চারা খেলতে ভালোবাসে-এটা তাদের স্বভাব। তাই খাওয়ানোর সময় খেলার ছলে এগোলে
কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। জোর করে মুখে তুলে দেওয়ার বদলে খাবারটাকে একটা মজার
অ্যাডভেঞ্চার বানিয়ে ফেলুন-দেখবেন বাচ্চা নিজেই এগিয়ে আসছে। খাবারকে গল্পের অংশ
করে দিন। "এই লাল গাজরটা হলো রাজকুমারের তলোয়ার, এটা খেলে তুমিও রাজকুমারের মতো
শক্তিশালী হবে"-এই ছোট্ট গল্পটুকুই বাচ্চার চোখ বড় করে দেয়। কল্পনার জগতে
বাচ্চারা সবচেয়ে বেশি সাড়া দেয়, সেটাকে কাজে লাগান। খাবারের সাথে ছোট্ট
চ্যালেঞ্জ দিন।
আরো পড়ুনঃ পাকিস্তানি ছেলেদের ইসলামিক নাম
"দেখি কে আগে এই ভাতটুকু শেষ করতে পারে" বা "এক চামচ খেলে একটা স্টার পাবে"-এই
ধরনের ছোট্ট গেমস বাচ্চার মনে উত্তেজনা তৈরি করে। প্রতিযোগিতার মজাটা পেলে
খাওয়াটা তার কাছে আর বোঝা মনে হয় না। বাচ্চাকে নিজে হাত দিয়ে খেতে দিন। হ্যাঁ,
একটু নোংরা হবে, কিন্তু সেটাই স্বাভাবিক। নিজে ধরে খেতে পারলে বাচ্চার মনে একটা
স্বাধীনতার অনুভূতি আসে, আর সেই অনুভূতিটাই তাকে আরও বেশি খেতে উৎসাহিত
করে।
একটু বাড়তি ঝামেলা সামলে নিন, লাভটা কিন্তু অনেক বড়। পুতুল বা খেলনাকে
"খাওয়ানোর" ভান করতে দিন বাচ্চাকে। "আগে পুতুলকে খাওয়াও, তারপর তুমি খাও"-এই
ছোট্ট কৌশলে বাচ্চা নিজেই খাওয়ার প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে। অনেক মা এই
পদ্ধতিতে দারুণ ফল পেয়েছেন, আপনিও একবার চেষ্টা করে দেখুন।
চাপ ছাড়া খাওয়ানোর সঠিক উপায়
চাপ দিয়ে কখনো ভালো কিছু হয় না-খাওয়ানোর ক্ষেত্রেও এটা সত্যি। বাচ্চা খাচ্ছে
না দেখে অনেক মা-বাবা রাগ করেন, চিৎকার করেন, জোর করেন। কিন্তু এতে বাচ্চার মনে
খাবারের প্রতি ভয় তৈরি হয়, আগ্রহ না। একবার সেই ভয় ঢুকে গেলে সেটা কাটাতে অনেক
সময় লেগে যায়। বাচ্চাকে সময় দিন, তাড়া দেবেন না। সে হয়তো ধীরে ধীরে খায়,
একটু এদিক-ওদিক তাকায়, একটু খেলে-এটাই তার স্বভাব। আপনি পাশে শান্তভাবে বসে
থাকুন, হাসিমুখে কথা বলুন। এই শান্ত পরিবেশটাই বাচ্চাকে স্বাভাবিকভাবে খেতে
সাহায্য করে।
"এক চামচও না খেলে বাইরে যেতে দেব না"-এই ধরনের শর্ত দেওয়া বন্ধ করুন। শিশুর
খাবারে রুচি না হলে করণীয় হলো শাস্তি বা পুরস্কারের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে
স্বাভাবিক একটা রুটিন তৈরি করা। খাবারকে শাস্তি বা পুরস্কারের সাথে জুড়ে দিলে
বাচ্চার মানসিক সম্পর্কটাই নষ্ট হয়ে যায়। বাচ্চা যদি একদিন কম খায়, সেটা নিয়ে
আতঙ্কিত হবেন না। একটা দিন কম খেলে শরীর ভেঙে পড়বে না। বরং আপনি যদি স্বাভাবিক
থাকেন, বাচ্চাও স্বাভাবিক থাকবে।
আপনার উদ্বেগটা বাচ্চা টের পায়, আর সেটাই অনেক সময় পরিস্থিতি আরও জটিল করে
দেয়। প্রতিটা খাবারের পর বাচ্চাকে ছোট্ট একটা প্রশংসা দিন। "আজকে তুমি খুব ভালো
খেয়েছ"-এই একটা বাক্য বাচ্চার মনে অনেক বড় প্রভাব ফেলে। ধীরে ধীরে সে বুঝতে
পারে যে খাওয়াটা একটা ভালো কাজ, আর সেই অনুভূতি থেকেই একটা সুন্দর অভ্যাস গড়ে
ওঠে।
পুষ্টি লুকিয়ে দেওয়ার টিপস
বাচ্চা সবজি খাবে না, ডাল খাবে না-এই সমস্যা প্রায় প্রতিটা ঘরেই আছে। কিন্তু
চালাক মায়েরা একটা কাজ করেন, পুষ্টিটা লুকিয়ে দেন খাবারের ভেতরে। বাচ্চা বুঝতেও
পারে না, খেয়েও ফেলে। এই কৌশলটা একবার রপ্ত করলে জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়। পালং
শাক বা লাউ সেদ্ধ করে ভালো করে ব্লেন্ড করুন, তারপর রুটির আটায় মিশিয়ে দিন।
রুটির রঙটা একটু সবুজ হবে, বাচ্চা সেটাকে "মজার রুটি" ভাববে। পুষ্টি ঢুকে যাচ্ছে,
আর বাচ্চা হাসিমুখে খাচ্ছে-এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে? গাজর বা মিষ্টি কুমড়া
সেদ্ধ করে ম্যাশ করুন, তারপর ডালের সাথে মিশিয়ে দিন। ডালের স্বাদে সবজির গন্ধটা
চাপা পড়ে যায়, বাচ্চা টেরই পায় না ভেতরে কী আছে।
এভাবে একটা বাটি ডালেই দুটো সবজির পুষ্টি দিয়ে দিতে পারেন অনায়াসে। ডিমের
অমলেটে সূক্ষ্মভাবে কুচি করা পেঁয়াজ, টমেটো, ক্যাপসিকাম মিশিয়ে দিন। শিশুর
খাবারে রুচি না হলে করণীয় হিসেবে এই পদ্ধতিটা সত্যিই দারুণ কাজ করে, কারণ
অমলেটের নরম টেক্সচারে সবজিগুলো মিশে যায়। বাচ্চা শুধু ডিমের স্বাদই পায়, সবজির
অস্তিত্ব টের পায় না। স্মুদি বা মিল্কশেকে কলা, আম বা স্ট্রবেরির সাথে পালং শাক
বা বিটরুট মিশিয়ে দিন। ফলের মিষ্টি স্বাদ আর রঙ এতটাই প্রভাবশালী যে সবজির কোনো
চিহ্নই থাকে না। বাচ্চা মজা করে চুমুক দিচ্ছে, আর আপনি মনে মনে হাসছেন-এটাই আসল
জয়।
ছোট ছোট খাবারের নিয়ম
শিশুর খাবারে রুচি না হলে করণীয় হিসেবে সবার আগে যে কাজটা করবেন, সেটা হলো
একবারে বেশি খাবার না দেওয়া। বড় প্লেট ভরা খাবার দেখলে বাচ্চার মনে একটা চাপ
তৈরি হয়। সে ভাবে, "এত্ত খাব কীভাবে?"-আর সেখান থেকেই অনীহাটা শুরু হয়। বরং
দিনে তিনবারের বদলে পাঁচ থেকে ছয়বার অল্প অল্প করে খাওয়ান। প্রতিবার একটু কম
দিন, কিন্তু বারবার দিন। এতে বাচ্চার পেট কখনো একদম খালি থাকে না, আবার বেশি ভরাও
থাকে না। এই ব্যালেন্সটা ধরে রাখতে পারলে রুচিটাও ধীরে ধীরে তৈরি হয়। ছোট ছোট
পরিমাণে দেওয়ার আরেকটা সুবিধা আছে। বাচ্চা যখন দেখে প্লেটটা শেষ হয়ে গেছে, তখন
একটা তৃপ্তির অনুভূতি পায়।
"আমি সব খেয়ে ফেলেছি"-এই ছোট্ট সাফল্যটা তার আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, আর পরের
বেলায় আবার খেতে আগ্রহী করে তোলে। খাবারের মাঝে বেশি স্ন্যাকস বা মিষ্টি জাতীয়
কিছু দেবেন না। এগুলো পেট ভরিয়ে রাখে, আর মূল খাবারের সময় বাচ্চার ক্ষুধাই থাকে
না। ক্ষুধাটা তৈরি হতে দিন, তাহলে খাবার দিলে সে নিজেই খাবে-আপনাকে পেছনে ছুটতে
হবে না। প্রতিটা ছোট্ট মিলে একটা করে নতুন খাবার যোগ করুন। আজকে একটু গাজর, কালকে
একটু মটরশুঁটি-এভাবে ধীরে ধীরে বাচ্চার খাবারের তালিকা বড় করুন। হঠাৎ অনেক কিছু
দিলে সে ঘাবড়ে যায়, কিন্তু একটু একটু করে দিলে অভ্যাসটা গড়ে ওঠে সহজেই।
ধৈর্য ধরার বাস্তব টিপস
ধৈর্য ধরা সহজ কথা, কিন্তু বাস্তবে করাটা কঠিন-বিশেষ করে যখন বাচ্চা টানা তিনদিন
ঠিকমতো খাচ্ছে না। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখুন, আপনার উদ্বেগ আর হতাশাটা বাচ্চা
সরাসরি অনুভব করে। আপনি যত শান্ত থাকবেন, পরিস্থিতি তত দ্রুত স্বাভাবিক হবে।
নিজেকে প্রতিদিন একটা ছোট্ট লক্ষ্য দিন। "আজকে জোর করব না, শুধু সামনে রাখব"-এই
সিদ্ধান্তটুকুই অনেক বড় পদক্ষেপ। ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণ হলে আপনার নিজেরও
আত্মবিশ্বাস বাড়ে, আর বাচ্চার সাথে সম্পর্কটাও ভালো থাকে। অন্য মায়েদের সাথে
কথা বলুন।
আপনি একা এই সমস্যায় পড়েননি, প্রায় প্রতিটা মা-ই এই পথ পার করেছেন। কারো
অভিজ্ঞতা শুনলে মনে একটা স্বস্তি আসে, আর নতুন আইডিয়াও পাওয়া যায়। একা বহন না
করে ভাগ করে নিন, হালকা লাগবে। বাচ্চার ছোট্ট উন্নতিগুলো লক্ষ্য করুন আর উদযাপন
করুন। গতকাল এক চামচ খেয়েছিল, আজকে দুই চামচ খেয়েছে-এটাও কিন্তু একটা জয়। এই
ছোট্ট অগ্রগতিগুলো দেখলে নিজেও অনুপ্রাণিত থাকবেন, আর হাল ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছেটা
কমে আসবে।
নিজের যত্নটাও নিন। ক্লান্ত, বিরক্ত মায়ের পক্ষে ধৈর্য ধরা সত্যিই কষ্টের। একটু
বিশ্রাম নিন, পছন্দের কিছু করুন, নিজেকে সময় দিন। আপনি ভালো থাকলে বাচ্চার জন্যও
ভালো থাকতে পারবেন-এটা বিলাসিতা না, এটা দরকার।
শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
শেষ পর্যন্ত একটাই কথা বলতে চাই-আপনি যে এতটা ভাবছেন, এতটা চেষ্টা করছেন, এটাই
প্রমাণ করে আপনি কতটা ভালো মা বা বাবা। নিখুঁত হওয়ার দরকার নেই, শুধু চেষ্টাটা
চালিয়ে যান। বাচ্চা একদিন ঠিকই বুঝবে, আপনি তার জন্য কতটা করেছেন। খাওয়ানোর এই
যাত্রাটা কখনো মসৃণ হয় না। কোনো দিন ভালো যাবে, কোনো দিন মনে হবে সব ব্যর্থ হয়ে
গেছে। কিন্তু একটা খারাপ দিন মানে পুরো যাত্রা শেষ না। আবার উঠুন, আবার চেষ্টা
করুন-এটাই আসল প্যারেন্টিং।
প্রতিটা শিশু আলাদা, প্রতিটা পরিবার আলাদা। কারো জন্য যা কাজ করেছে, আপনার
বাচ্চার জন্য সেটা নাও করতে পারে। তাই অন্যের সাথে তুলনা করবেন না, নিজের
বাচ্চাকে বুঝুন। সে-ই আপনাকে বলে দেবে তার কী দরকার। সবশেষে, ভালোবাসাটা যেন কখনো
হারিয়ে না যায়।
রাগ হবে, হতাশা আসবে-কিন্তু বাচ্চার চোখে যখন তাকাবেন, সব ক্লান্তি কোথায় যেন
মিলিয়ে যায়। ওই একটা হাসিই আপনার সব পরিশ্রমের পুরস্কার-এটা মনে রাখলে পথটা
অনেক সহজ হয়ে যাবে। 260416


